বাংলাদেশের জাতীয় বাজেট কেবল আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়; এটি একটি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক দর্শন, অগ্রাধিকারের প্রতিচ্ছবি এবং ভবিষ্যৎ উন্নয়নের রূপরেখা।
স্বাধীনতার ৫৫ বছর পর আজ যখন নতুন বাজেট নিয়ে দেশজুড়ে আলোচনা চলছে, তখন ইতিহাসের পাতায় ফিরে তাকালে চোখে পড়ে বাংলাদেশের প্রথম অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদের অসাধারণ দূরদর্শিতা। যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি রাষ্ট্রের পুনর্গঠনের দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে তিনি যে বাজেট উপস্থাপন করেছিলেন, তার অনেক মৌলিক দর্শনের প্রতিফলন আজকের বাজেটেও খুঁজে পাওয়া যায়।
১৯৭২ সালের ৩০ জুন তাজউদ্দীন আহমেদ একই দিনে দুটি বাজেট উপস্থাপন করেন। একটি ছিল স্বাধীনতার পরবর্তী অন্তর্বর্তীকালীন সময়ের জন্য পুনর্গঠনমূলক বাজেট এবং অন্যটি ছিল ১৯৭২-৭৩ অর্থবছরের পূর্ণাঙ্গ বাজেট। সদ্য স্বাধীন দেশটির সামনে তখন ছিল ভয়াবহ সংকট—বিধ্বস্ত অবকাঠামো, উৎপাদন ব্যবস্থার বিপর্যয়, খাদ্য সংকট, সীমিত রাজস্ব এবং লাখো বাস্তুচ্যুত মানুষের পুনর্বাসনের চ্যালেঞ্জ।
আজকের বাংলাদেশের বাস্তবতা ভিন্ন। অর্থনীতির আকার বেড়েছে বহুগুণ, বৈদেশিক বাণিজ্য সম্প্রসারিত হয়েছে, প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির বিকাশ ঘটেছে এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন দৃশ্যমান হয়েছে। তবুও প্রথম বাজেট ও বর্তমান বাজেটের মধ্যে কিছু গুরুত্বপূর্ণ সাদৃশ্য আমাদের গভীরভাবে ভাবায়।
প্রথমত, উভয় বাজেটের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে জনগণের জীবনমান উন্নয়ন। তাজউদ্দীন আহমেদ যুদ্ধবিধ্বস্ত মানুষের পুনর্বাসন, খাদ্য নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম সচল রাখাকে অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন। বর্তমান বাজেটেও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সহায়তা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং মানবসম্পদ উন্নয়নকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, আত্মনির্ভরশীলতার দর্শন দুই সময়ের বাজেটকেই এক সুতোয় বেঁধেছে। স্বাধীনতার পর সীমিত সম্পদ নিয়েও দেশীয় উৎপাদন বৃদ্ধি, কৃষি পুনরুদ্ধার এবং রাজস্ব আহরণে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। আজও আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে স্থানীয় শিল্প বিকাশ, কর আদায় বৃদ্ধি এবং নিজস্ব অর্থনৈতিক সক্ষমতা শক্তিশালী করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হচ্ছে।
তৃতীয়ত, সংকট মোকাবিলার বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি দুই বাজেটের অন্যতম মিল। তাজউদ্দীন আহমেদ যুদ্ধ-পরবর্তী দুরবস্থায় কঠোর সাশ্রয় নীতি গ্রহণ করেছিলেন। বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতির অস্থিরতা, মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ এবং বৈশ্বিক রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যেও বাজেট প্রণয়নে একই ধরনের সতর্কতা ও বাস্তবতার প্রতিফলন দেখা যায়।
চতুর্থত, উন্নয়ন পরিকল্পনার ধারাবাহিকতা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক যাত্রার সবচেয়ে বড় শক্তি। প্রথম বাজেটে পুনর্গঠন ছিল লক্ষ্য; আজকের বাজেটে উন্নত ও টেকসই অর্থনীতির ভিত্তি নির্মাণের স্বপ্ন প্রতিফলিত হচ্ছে। লক্ষ্য বদলেছে, কিন্তু রাষ্ট্রকে এগিয়ে নেওয়ার অঙ্গীকার অপরিবর্তিত রয়েছে।
তবে বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো বাজেট বাস্তবায়নের দক্ষতা, সুশাসন নিশ্চিত করা এবং অপচয় ও দুর্নীতি রোধ করা। তাজউদ্দীন আহমেদের রাজনৈতিক সততা ও দায়িত্ববোধ আজও রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। বাজেটের সফলতা কেবল বড় অঙ্কের বরাদ্দে নয়; বরং তার স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং জনকল্যাণমুখী বাস্তবায়নের মধ্যেই নিহিত।
নতুন প্রজন্মের কাছে বাংলাদেশের প্রথম বাজেটের ইতিহাস তুলে ধরা প্রয়োজন। কারণ তারা জানতে পারবে—আজকের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা হঠাৎ করে তৈরি হয়নি। যুদ্ধবিধ্বস্ত ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে কিছু দূরদর্শী নেতৃত্ব, সীমাহীন দেশপ্রেম এবং কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়ার সাহস থেকেই এই পথচলার সূচনা হয়েছিল।
আজকের বাজেট নিয়ে মতভেদ, সমালোচনা কিংবা বিতর্ক থাকতেই পারে। গণতান্ত্রিক সমাজে সেটিই স্বাভাবিক। কিন্তু ইতিহাস আমাদের শেখায়, সংকট যত গভীরই হোক না কেন, সঠিক পরিকল্পনা, সততা এবং জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা থাকলে একটি জাতি ঘুরে দাঁড়াতে পারে।
তাজউদ্দীন আহমেদের প্রথম বাজেট সেই বিশ্বাসেরই প্রতীক। আর বর্তমান বাজেটের সবচেয়ে বড় তাৎপর্য হলো—স্বাধীনতার সেই স্বপ্নকে আরও শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড় করিয়ে একটি সমৃদ্ধ, বৈষম্যহীন ও আত্মমর্যাদাশীল বাংলাদেশ নির্মাণের পথকে সুদৃঢ় করা।
“ইতিহাস কেবল অতীতের স্মৃতি নয়; বর্তমানের পথচলা ও ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনাও বটে। প্রথম বাজেটের সেই দূরদর্শিতা আজও আমাদের অর্থনৈতিক অভিযাত্রার প্রেরণার উৎস হয়ে আছে।”
কলাম লেখক:
মো: আল-আমিন,নির্বাহী সম্পাদক
দৈনিক ভোরের হাওয়া
Leave a Reply