মো:আল-আমিন
নির্বাহী সম্পাদক, দৈনিক ভোরের হাওয়া
পবিত্র ঈদুল আজহায় পশু কোরবানি এবার কিছুটা কম হলেও দেশজুড়ে চামড়া সংগ্রহের হার খুব একটা কমেনি। তবে বিপুল পরিমাণ এই চামড়া শেষ পর্যন্ত কাদের হাতে যাবে এবং প্রক্রিয়াকরণ শেষে কী মানে পৌঁছাবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েই গেছে।
প্রতি বছরের ন্যায় এবারও সরকারিভাবে চামড়ার দাম কিছুটা বাড়িয়ে নির্ধারণ করা হলেও মাঠপর্যায়ে তার প্রতিফলন ঘটেনি। ফলে কোরবানিদাতারা যেমন ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হয়েছেন, তেমনি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এতিমখানা ও মাদ্রাসার মতো ধর্মীয় ও দাতব্য প্রতিষ্ঠানগুলো। সবচেয়ে তিক্ত অভিজ্ঞতার শিকার হয়েছেন মৌসুমি ব্যবসায়ীরা, যাদের সংগৃহীত চামড়া কিনতে আড়তদারদের চরম অনাগ্রহ দেখা গেছে।
চামড়া খাতের এই অস্থিতিশীলতার জন্য ব্যাংক, ট্যানারি মালিক ও আড়তদাররা একে অপরকে দায়ী করে আসছেন। ট্যানারি মালিকদের দাবি, চামড়া প্রক্রিয়াকরণে ব্যয় বৃদ্ধি এবং মানসম্মত লবণযুক্ত চামড়ার অভাবের কারণে সরকার-নির্ধারিত দামে কেনা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। অন্যদিকে, অর্থ সংকট ও অব্যবস্থাপনার কারণে প্রতি বছরই চামড়া নষ্ট হওয়ার বা ফেলে দেওয়ার মতো দুঃখজনক ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটছে। অথচ এক যুগ আগেও এই চামড়া ছিল উচ্চমূল্যের পণ্য।
আমাদের এই ব্যর্থতার মূল কারণ মূলত পরিবেশবান্ধব শিল্প গড়ে তোলার ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের অবহেলা। লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপের (LWG) আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পূরণ করতে না পারায় আমাদের ট্যানারিগুলো ইউরোপ ও আমেরিকার বাজারে ভালো দাম পাচ্ছে না। ফলে উচ্চমূল্যের বাজারে প্রবেশাধিকার না পেয়ে আধা-প্রক্রিয়াজাত চামড়া রপ্তানি করেই সন্তুষ্ট থাকতে হচ্ছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে দাঁড়িয়েছে যে, আন্তর্জাতিক সনদপ্রাপ্ত হাতেগোনা কিছু প্রতিষ্ঠানকে পশ্চিমা ক্রেতাদের শর্ত পূরণে উল্টো বিদেশ থেকে চামড়া আমদানি করতে হচ্ছে, অথচ দেশে প্রতি বছর বিপুল কাঁচা চামড়ার জোগান থাকছে।
সাভারে চামড়া শিল্পনগরী স্থানান্তরের পরও কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জিত না হওয়া একটি বড় উদ্বেগের বিষয়। সরকারি উদ্যোগে প্রতি বছর কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হলেও তাতে সমন্বয়হীনতার ছাপ স্পষ্ট। একযোগে বিপুল পরিমাণ চামড়া সংগৃহীত হলে তার রক্ষণাবেক্ষণ ও স্বচ্ছ বেচাকেনা নিশ্চিত করা চ্যালেঞ্জিং, কিন্তু তা অসম্ভব নয়।
আমরা মনে করি, চামড়া খাতের এই দীর্ঘমেয়াদী সংকট কাটাতে নতুন সরকারকে এখনই উদ্যোগী হতে হবে। পশ্চিমা ক্রেতাদের মানদণ্ড অনুযায়ী শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে গড়ে তোলার আগ পর্যন্ত প্রতি বছর এই একই পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে। যারা নিজ উদ্যোগে পরিবেশসম্মত ইফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (ETP) স্থাপনে আগ্রহী, তাদের ব্যবসায়িক সুযোগ করে দেওয়া সময়ের দাবি। এছাড়া আমাদের ক্রমবর্ধমান অভ্যন্তরীণ চাহিদাকে কাজে লাগিয়ে ভৈরবের মতো অন্যান্য অঞ্চলেও চামড়াজাত পণ্য উৎপাদনের প্রসার ঘটানো প্রয়োজন।
পরিশেষে, পশু কোরবানি থেকে প্রাপ্ত চামড়া নষ্ট হওয়া মানে কেবল ব্যবসায়ীদের লোকসান নয়, এটি আমাদের জাতীয় অর্থনীতির ক্ষতি। দ্রুত এই পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন সম্ভব না হলেও, ঘুরে দাঁড়ানোর একটি আন্তরিক ও দৃশ্যমান কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। আগামী ঈদের আগে যেন এই বিপর্যয় রোধ করা যায়, তার জন্য সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে নিয়ে অবিলম্বে নির্মোহ পর্যালোচনার আহ্বান জানাচ্ছি।
Leave a Reply