মো:আল-আমিন
বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন এক অভূতপূর্ব অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হচ্ছে। একদিকে সরকারের পক্ষ থেকে উন্নয়নের বর্ণিল তকমা আর “জনগণের আস্থা”র দাবি তোলা হচ্ছে, অন্যদিকে মাঠপর্যায়ের রূঢ় বাস্তবতা ও সাধারণ মানুষের দীর্ঘশ্বাস সেই দাবির সাথে এক বিশাল ব্যবধান তৈরি করেছে। বৈশ্বিক মন্দার দোহাই দিয়ে সবকিছুর দাম বাড়ানো হলেও অভ্যন্তরীণ অব্যবস্থাপনা, নীতিমালার অসামঞ্জস্যতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির যে চিত্র ফুটে উঠছে, তা জনমনে কেবল ক্ষোভেরই জন্ম দিচ্ছে।
১.জ্বালানি ও বিদ্যুতের সংকটে স্থবির জনপদ:জ্বালানি তেলের রেকর্ড মূল্যবৃদ্ধি কেবল একটি গাণিতিক পরিবর্তন নয়; এটি পরিবহন থেকে শুরু করে নিত্যপণ্যের বাজারে এক আগুনের ঝাপটা। বর্তমানে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার ভঙ্গুর দশা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। খুলনাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ১০টির মধ্যে ৬টি বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ থাকা এবং গ্রামগঞ্জে ১৬-১৭ ঘণ্টা লোডশেডিং জনজীবনকে অতিষ্ঠ করে তুলেছে। বিশেষ করে কৃষিখাতে এর প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী। জ্বালানির অভাবে সেচ সংকট এবং গ্যাসের অভাবে সার কারখানা বন্ধ হওয়া আগামী মৌসুমে খাদ্য নিরাপত্তার জন্য এক অশনিসংকেত।
২.অর্থনীতির ঋণনির্ভরতা ও মুদ্রাস্ফীতি:সরকার পরিচালনার দৈনন্দিন ব্যয় মেটাতে যে হারে ঋণ গ্রহণ করা হচ্ছে, তা দেশের দীর্ঘমেয়াদী অর্থনীতিকে চরম ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। এক বছরের ঋণের লক্ষ্যমাত্রা যখন সাত-আট মাসেই ফুরিয়ে যায়, তখন বাজেটের অদূরদর্শিতা প্রকট হয়ে ওঠে। এলপিজি সিলিন্ডার থেকে শুরু করে নিত্যপণ্যের লাগামহীন দাম মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের ক্রয়ক্ষমতাকে পিষ্ট করছে। আয় না বাড়লেও ব্যয়ের এই অমানবিক কষাঘাতে সাধারণ মানুষ আজ দিশেহারা।
৩.কর্মসংস্থান ও ক্রমবর্ধমান আয়বৈষম্য:আমাদের উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় কর্মসংস্থান সৃষ্টির হার আশানুরূপ নয়। উন্নয়নের সুফল সমাজের সর্বস্তরে না পৌঁছে কেবল গুটিকতক প্রভাবশালী ও আশীর্বাদপুষ্ট মানুষের হাতে কুক্ষিগত হচ্ছে। শহরকেন্দ্রিক চাকচিক্যময় অবকাঠামোর বিপরীতে পল্লী অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রার মান এখনো দুঃখ-দারিদ্র্যের আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছে। গণতান্ত্রিক অধিকার ও সুশাসনের অভাব উন্নয়নের প্রকৃত সুফল থেকে সাধারণ জনগণকে বঞ্চিত করছে।
৪.দুর্নীতির মহোৎসব ও ত্যাগের বৈষম্য:দেশের বর্তমান সংকটে যখন সাধারণ মানুষকে “ত্যাগ” স্বীকারের আহ্বান জানানো হয়, তখন রাষ্ট্রের উচ্চপর্যায়ে দুর্নীতির চিত্র দেখে জনগণ হতাশ হয়। একদিকে তেলের পাম্পে মানুষের নির্ঘুম রাত কাটে, অন্যদিকে সংসদের কেনাকাটায় ৪ হাজার টাকার ব্যাগের দাম ৩৪ হাজার টাকা দেখানো হয়। এই “ব্যাগ কাণ্ড” বা “বালিশ কাণ্ড” সাধারণ মানুষের কাটা ঘায়ে নুনের ছিটার মতো। ত্যাগের ভার কেন কেবল আমজনতার ওপরই চাপানো হবে—এই প্রশ্ন আজ অবধারিত।
৫.নীতিনির্ধারণী ব্যর্থতা ও আস্থার সংকট:সরকার বৈশ্বিক পরিস্থিতির কথা বললেও অভ্যন্তরীণ অপচয় রোধে সদিচ্ছার অভাব স্পষ্ট। ডলার সংকটের মাঝেও বিলাসদ্রব্য আমদানিতে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ না আসা এবং বাজার সিন্ডিকেট দমনে ব্যর্থতা প্রমাণ করে যে, সাধারণ মানুষের চেয়ে প্রভাবশালী ব্যবসায়ীদের স্বার্থই এখানে বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে। জনগণের কষ্টের বাস্তবতাকে আড়াল করে “সব ঠিক আছে” বলার প্রবণতা সরকারের প্রতি জনমানুষের আস্থাকে তলানিতে নিয়ে যাচ্ছে।
উত্তরণের পথ যাওয়া অতীব জরুরি :
বর্তমান সংকট থেকে উত্তরণ এবং জনজীবনে স্বস্তি ফেরাতে সরকারের উচিত আত্মতুষ্টির দেয়াল ভেঙে বাস্তবমুখী ও জনবান্ধব নীতি গ্রহণ করা:
কৃষিতে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার: খাদ্য উৎপাদন নিশ্চিত করতে সার কারখানাগুলো অবিলম্বে সচল করতে হবে এবং কৃষকের সেচ সুবিধার জন্য জরুরি ভিত্তিতে জ্বালানি বরাদ্দ করতে হবে।
কঠোর ব্যয় সংকোচন: সরকারি কর্মকর্তাদের অপ্রয়োজনীয় বিদেশ ভ্রমণ, বিলাসবহুল গাড়ি কেনা এবং কম গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পগুলো অবিলম্বে স্থগিত করতে হবে। এই সাশ্রয়কৃত অর্থ সাধারণ মানুষের ভর্তুকিতে কাজে লাগাতে হবে।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স:কেনাকাটায় হরিলুট বন্ধে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে বাজার সিন্ডিকেট ও দুর্নীতিবাজদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে হবে।
বিকল্প ও স্থানীয় জ্বালানি: কেবল আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে স্থানীয় গ্যাস অনুসন্ধান এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানো এখন সময়ের দাবি।
সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী জোরদার: মধ্য ও নিম্নবিত্তের জন্য টিসিবির মাধ্যমে সাশ্রয়ী পণ্যের সরবরাহ বাড়াতে হবে এবং ডিজিটাল রেশন কার্ডের আওতা গ্রাম পর্যন্ত বিস্তৃত করতে হবে।
উন্নয়ন যখন মানুষের জীবনের মান উন্নত না করে কেবল দৃশ্যমান অবকাঠামোতে সীমাবদ্ধ থাকে, তখন তা প্রকৃত উন্নয়ন হতে পারে না। গালভরা উন্নয়নের বুলিতে ক্ষুধার্ত পেটের জ্বালা মেটে না।
উন্নয়ন তখনই সার্থক হবে, যখন তা সাম্য, সুশাসন এবং প্রতিটি মানুষের মৌলিক সংকটের সমাধান নিশ্চিত করবে। সরকারের উচিত বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে প্রকৃত জনবান্ধব শাসক হিসেবে জনগণের পাশে দাঁড়ানো।
Leave a Reply