মো:আল-আমিন
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ইতিহাসে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেট কেবল একটি আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়; এটি একটি নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার অর্থনৈতিক রূপরেখা।
দীর্ঘ ১৭ বছর পর বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেট উপস্থাপন করেছে। ফলে এই বাজেটকে শুধু অর্থনৈতিক দলিল হিসেবে নয়, বরং নতুন সরকারের রাজনৈতিক দর্শন, অর্থনৈতিক অঙ্গীকার এবং রাষ্ট্র পুনর্গঠনের রোডম্যাপ হিসেবেও মূল্যায়ন করতে হবে।
সরকার মোট ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব করেছে। এর বিপরীতে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। ফলে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা, যা দেশের মোট জিডিপির প্রায় ৩.৬ শতাংশ। আন্তর্জাতিক অর্থনীতির পরিভাষায় এই ঘাটতি অস্বাভাবিক নয়। বিশ্বের বহু উন্নয়নশীল দেশ প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করতে ঘাটতি বাজেট গ্রহণ করে। কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এই ঘাটতির সফলতা নির্ভর করবে এর অর্থায়ন ও বাস্তবায়নের ওপর।
২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ মোড় পরিবর্তনের ঘটনা। সেই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে জনগণ শুধু সরকার পরিবর্তনের দাবি তোলেনি, বরং একটি জবাবদিহিমূলক, স্বচ্ছ এবং জনগণকেন্দ্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছে। সেই প্রেক্ষাপটে নতুন সরকারের প্রথম বাজেট জনগণের কাছে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। কারণ এই বাজেটই বলে দেবে—পরিবর্তনের অঙ্গীকার কতটা বাস্তব রূপ পেতে যাচ্ছে।
বর্তমানে দেশের অন্যতম বড় অর্থনৈতিক সংকট মূল্যস্ফীতি। দীর্ঘ সময় ধরে খাদ্যপণ্য, জ্বালানি, পরিবহন এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তুলেছে। মধ্যবিত্ত শ্রেণি তাদের সঞ্চয় হারাচ্ছে, আর নিম্নআয়ের মানুষের জন্য দৈনন্দিন জীবনধারণই হয়ে উঠছে সংগ্রামের বিষয়। এই বাস্তবতায় বড় আকারের ঘাটতি বাজেট অর্থনীতিতে নতুন চাপ সৃষ্টি করতে পারে, যদি না তা সঠিকভাবে পরিচালিত হয়।
সরকারকে এই ঘাটতি পূরণ করতে হবে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক উৎস থেকে ঋণ গ্রহণের মাধ্যমে। কিন্তু অতিরিক্ত ব্যাংক ঋণ বেসরকারি খাতের বিনিয়োগকে সংকুচিত করতে পারে। অন্যদিকে বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ বেড়ে গেলে ভবিষ্যতে ঋণ পরিশোধের চাপও বাড়বে। ফলে ঘাটতি নিজে সমস্যা নয়; সমস্যা হলো সেই অর্থের ব্যবহার কতটা ফলপ্রসূ হবে।
অর্থনীতির মৌলিক সত্য হলো—ঋণ নিয়ে ভোগ নয়, ঋণ নিয়ে উৎপাদন করতে হয়। যদি এই বাজেটের অর্থ কৃষি, শিল্প, তথ্যপ্রযুক্তি, অবকাঠামো, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানমুখী খাতে ব্যয় হয়, তাহলে তা দেশের উৎপাদনশীলতা বাড়াবে এবং ভবিষ্যতে রাজস্ব আয় বৃদ্ধি করবে। কিন্তু যদি অর্থের বড় অংশ প্রশাসনিক ব্যয়, অদক্ষ প্রকল্প কিংবা রাজনৈতিক বিবেচনায় ব্যয় হয়, তাহলে এই ঘাটতি অর্থনীতির জন্য নতুন বোঝায় পরিণত হবে।
রাজস্ব সংগ্রহের ক্ষেত্রেও সরকারের সামনে কঠিন চ্যালেঞ্জ রয়েছে। ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব লক্ষ্য অর্জন করতে হলে কর ব্যবস্থায় সংস্কার, কর ফাঁকি রোধ এবং করের আওতা সম্প্রসারণ অপরিহার্য। দীর্ঘদিন ধরে দেশের করব্যবস্থা সীমিতসংখ্যক করদাতার ওপর নির্ভরশীল। নতুন বিনিয়োগ, ব্যবসা সম্প্রসারণ এবং কর প্রশাসনের ডিজিটাল রূপান্তর ছাড়া এই লক্ষ্য অর্জন সহজ হবে না।
তবে বাজেটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন অর্থনীতির পরিসংখ্যান নয়, কর্মসংস্থান। দেশের লাখো তরুণ শিক্ষাজীবন শেষ করেও কর্মসংস্থানের সুযোগ পাচ্ছেন না। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি তখনই অর্থবহ, যখন তা মানুষের জীবনে চাকরি, আয় এবং নিরাপত্তা নিয়ে আসে। সুতরাং নতুন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং তরুণ জনগোষ্ঠীকে উৎপাদনশীল অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করা।
রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও এই বাজেট তাৎপর্যপূর্ণ। বাজেট বক্তৃতায় জুলাই আন্দোলনের চেতনা, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার এবং রাষ্ট্র সংস্কারের অঙ্গীকারের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু জনগণ এখন আর শুধু প্রতিশ্রুতি শুনতে চায় না; তারা ফলাফল দেখতে চায়। বাজারে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, দুর্নীতি হ্রাস, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠাই হবে সরকারের প্রকৃত সফলতার সূচক।
পরিশেষে বলা যায়, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের এই ঘাটতি বাজেট নতুন সরকারের জন্য যেমন একটি সুযোগ, তেমনি একটি কঠিন পরীক্ষা। এই বাজেট দেশের অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করতে পারে, আবার ভুল বাস্তবায়নের কারণে নতুন সংকটও সৃষ্টি করতে পারে। ইতিহাস শেষ পর্যন্ত বাজেটের আকার নয়, বাজেটের প্রভাবকে স্মরণ রাখে।
আজ তাই প্রশ্ন একটাই—২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকার এই ঘাটতি কি নতুন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পুনর্জাগরণের ভিত্তি হবে, নাকি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আরেকটি ঋণের বোঝা হয়ে দাঁড়াবে? এর উত্তর লুকিয়ে আছে সরকারের দক্ষতা, সুশাসন এবং জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতার মধ্যে।
— মো: আল-আমিন
নির্বাহী সম্পাদক, দৈনিক ভোরের হাওয়া
Leave a Reply