মো: আল-আমিন,নির্বাহী সম্পাদক, দৈনিক ভোরের হাওয়া
বাংলাদেশের গণমাধ্যম আজ এক গভীর আত্মসংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এটি কেবল প্রযুক্তির বা অর্থনীতির সংকট নয়, এটি মূলত দৃষ্টিভঙ্গির সংকট। সংবাদমাধ্যম আজ এমন এক বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে, যেখানে সংবাদ নির্বাচনই রাজনৈতিক অবস্থান ও আনুগত্যের চূড়ান্ত পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রশ্নটা এখন আর সংবাদমূল্য নিয়ে নেই, প্রশ্নটা দাঁড়িয়েছে—আমরা কি সত্যিই জনস্বার্থের সাংবাদিকতা করছি, নাকি ক্ষমতার চারপাশেই ঘুরপাক খাচ্ছি?
সম্প্রতি জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-এর মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার দক্ষিণ কোরিয়ায় জাতিসংঘ সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশগ্রহণ কিংবা ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়ইমের চীন সফর—আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের প্রেক্ষাপটে এই ঘটনাগুলো অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, দেশের মূলধারার গণমাধ্যমের বড় অংশ এসব সংবাদকে এড়িয়ে গেছে। অথচ একই সময়ে রাজনীতির মাঠের গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলোকে উপেক্ষা করে কোনো নেতা বা মন্ত্রীর গাড়ির পেছনে কর্মীদের দৌড়ঝাঁপ, কিংবা কার গাড়ির পেছনে কে হাঁটলো—তা নিয়ে মিডিয়ার ক্যামেরার যে অস্বাভাবিক ব্যস্ততা ও কভারেজ, তা আমাদের সংবাদমূল্যের মানদণ্ড নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তুলে দেয়।
কেন এমনটা ঘটছে? উত্তরটা সহজ হলেও তেতো। মিডিয়ার একটি বড় অংশ বহু বছর ধরেই ‘অ্যাক্সেস জার্নালিজম’-এ অভ্যস্ত। ক্ষমতার বলয় বদলালেও সাংবাদিকতার চরিত্রগত পরিবর্তন খুব একটা ঘটেনি। এখনো নিউজরুমে বসে সাংবাদিকরা ভাবেন, “এই সংবাদটি প্রচার করলে কারা খুশি হবে?”—জনগণ কী জানল বা অজানল, তা অধিকাংশ ক্ষেত্রে গৌণ হয়ে পড়ে। সাংবাদিকতা আজ নীতি বা সাহসের চেয়ে ‘সম্পর্ক রক্ষা’র হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে।
যখন আন্তর্জাতিক সম্মেলনে তরুণ নেতাদের কূটনৈতিক ভূমিকা সংবাদপত্রের পাতায় জায়গা পায় না, কিন্তু কোনো নেতা বা মন্ত্রীর প্রটোকল আর গাড়ির পেছনে কর্মীদের হুড়োহুড়ি ‘ব্রেকিং নিউজ’ হয়, তখন রাজনৈতিক বোধও তুচ্ছতায় আটকে যায়। এটি শুধু মিডিয়ার সংকট নয়, এটি গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্যও বিপজ্জনক। কারণ জনগণ যখন বাস্তব ও গঠনমূলক সংবাদের চেয়ে ক্ষমতার এমন প্রদর্শনীমূলক বিনোদন বেশি পায়, তখন তারা নীতিগত রাজনীতি থেকে বিমুখ হয়ে পড়ে।
গণমাধ্যমের কাজ রাজনৈতিক বিনোদন তৈরি করা নয়; বরং বাস্তবতা তুলে ধরা, গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুকে সামনে আনা এবং সমাজকে প্রশ্ন করতে শেখানো। আজকের বাস্তবতায় আমাদের নতুন কোনো ডিজিটাল ক্যামেরার প্রয়োজন নেই; প্রয়োজন নতুন দৃষ্টিভঙ্গি। প্রয়োজন নৈতিক সাহস। একটি সংবাদমাধ্যম যদি জনগণের চেয়ে ক্ষমতাকে বেশি গুরুত্ব দেয়, তবে ইতিহাস তাকে স্বাধীন গণমাধ্যম হিসেবে নয়, বরং ক্ষমতার সহযাত্রী হিসেবেই মনে রাখবে।
আমরা কি সাংবাদিকতা করব, নাকি ক্ষমতার পেছনে ক্যামেরার দৌড় করাবো? এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার সময় এখনই। নতুবা আমাদের নিউজরুমগুলো ভবিষ্যতে কেবল একটি ‘পলিটিক্যাল পিআর এজেন্সি’ হিসেবেই পরিচিতি পাবে। সময় থাকতে আমাদের সেই বৃত্ত ভাঙতে হবে, ফিরতে হবে সত্য ও জনস্বার্থের সাংবাদিকতায়।
দৈনিক ভোরের হাওয়া তার নীতি ও পেশাদারিত্বের অংশ হিসেবে অনুসন্ধানমূলক ও জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট সাংবাদিকতার প্রতি দায়বদ্ধ। আমরা মনে করি, সাংবাদিকতা কোনো বিশেষ বলয়ের সুবিধাভোগী নয়, বরং রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে মানুষের কণ্ঠস্বর হওয়া উচিত।
Leave a Reply