ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে অবৈধ প্রভাব খাটিয়ে কোটি কোটি টাকা উপার্জন ও অর্জিত টাকা অবৈধভাবে বিদেশে পাচারকারী হিসেবে দুদকের খাতায় অভিযুক্ত, সিলেট অঞ্চলের প্রভাবশালী ব্যবসায়ী আকিকুর রহমান চৌধুরী (শিপু) এখন বিএনপির ছায়াতলে আশ্রয় পেয়ে গেছেন।
তার ঘনিষ্ট বন্ধু বিএনপি নেতা ইশতিয়াক আহমেদ সিদ্দিকীর মাধ্যমে মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীর আশীর্বাদপুষ্ট হয়ে আকিকুর রহমান চৌধুরী (শিপু) সকল মামলা মোকদ্দমা থেকে পরিত্রাণ পেয়েছেন। এখন তিনি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এর মামলা থেকে বাঁচার চেষ্টা করছেন।
দুদক এর মামলা ও স্থানীয় বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায়, ব্রিটিশ বাংলাদেশী আকিকুর রহমান চৌধুরী (শিপু) সিলেট অঞ্চলে এক বহুল আলোচিত নাম। অনেকের কাছেই তিনি দুর্নীতি, প্রভাব বিস্তার ও ক্ষমতার অপব্যবহারের প্রতীক হিসেবে পরিচিত।
সিলেট শহরের ভটিশ্বরের বাসিন্দা মরহুম আতাউর রহমান চৌধুরীর সন্তান আকিকুর রহমান চৌধুরী (শিপু)| তার চাচা ছিলেন আওয়ামী লীগ সরকারের প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শফিকুর রহমান চৌধুরী| আকিকুর রহমান চৌধুরী (শিপু) বর্তমানে রিকার্শন ফিন টেক লিমিটেডের চেয়ারম্যান| তবে ব্যবসায়িক পরিচয়ের আড়ালে তার উত্থানের গল্প ঘিরে রয়েছে নানা বিতর্ক ও অভিযোগ|
অভিযোগ রয়েছে, শিপুর কর্মকাণ্ডে অসন্তুষ্ট হয়ে তৎকালীন প্রতিমন্ত্রী শফিকুর রহমান চৌধুরীর প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব তাকে মন্ত্রণালয়ে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিলেন| এরপর তিনি ভিন্ন পরিচয়ে পুনরায় সেখানে কার্যক্রম চালিয়ে যান| তিনি তার চাচা শফিকুর রহমান চৌধুরীর পিও (পার্সোনাল অফিসার) হিসেবে মন্ত্রণালয়ে আসা যাওয়া করতেন| চাচা শফিকুর রহমান চৌধুরীরকে ব্যবহার করে মন্ত্রী হওয়ার ২ মাসের মধ্যেই আকিকুর রহমান (শিপু) আদম ব্যবসার লাইসেন্স গ্রহণ করেন এবং রাজধানী ঢাকার বনানীর “গ্র্যান্ডিউর গুলশান” ভবনে নতুন অফিস স্থাপন করেন| এর আগে ২০০৮ সালে শফিকুর রহমান চৌধুরী এমপি নির্বাচিত হয়ে বেসামরিক বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য হয়েছিলেন| তখন আকিকুর রহমান শিপু বিমানবন্দরে প্রভাব বিস্তার করে ওয়্যার বন্ড হাউজের লাইসেন্স নেওয়ার সুযোগ পান| চাচা শফিকুর রহমান চৌধুরী ২০০৮ সালে প্রথমবারের মতো আওয়ামী লীগের এমপি হলে উচ্চাবিলাসী আকিকুর রহমান চৌধুরী (শিপু) প্রভাব খাটিয়ে নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করেন| ওই সময় তিনি লন্ডনে নিজের স্ত্রী ও ২ সন্তান রেখে ঢাকায় তার ব্যবসায়িক পার্টনারের স্ত্রীর সঙ্গে পরকীয়ার এক পর্যায় দ্বিতীয় বিয়ে করেন এবং নতুন বিয়ের পর বাংলাদেশেই বসবাস করছেন| ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ফ্যাসিস্ট হাসিনার সরকারের পতনের পর থেকে তিনি মধ্যপ্রাচ্যে পরিবার নিয়ে বসবাসের সুযোগ করেন| তিনি অবৈধ উপার্জন করা টাকা ইউকে আর মধ্যপ্রাচ্যে পাচার করেন বলে বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে!
শুধু তাই নয়, সাবেক মন্ত্রী লতিফ সিদ্দিকীর সঙ্গে অবৈধ ভিওআইপি ব্যবসার সঙ্গেও তিনি যুক্ত ছিলেন| বিষয়টি ছিল তখন ওপেন সিক্রেট|
আওয়ামী লীগের পাতানো নির্বাচনের আগে ও পরে তিনি সরাসরি চাচা শফিকুর রহমানের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিলেন| সিলেট অঞ্চলে তার প্রভাব এতটাই বিস্তৃত ছিল যে, স্থানীয়দের অনেকে তাকে কার্যত “মন্ত্রী” হিসেবেই দেখতেন| এমনও বলা হতো- শফিকুর রহমান চৌধুরী তার ভাতিজাকে ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ কোনো সিদ্ধান্ত নিতেন না|
জুলাইয়ের রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় জনরোষের মুখে সিলেটের টিলাঘরে অবস্থিত শফিকুর রহমান চৌধুরীর বাড়িটি আগুন দিয়ে পুড়ে ফেলে বিক্ষুব্ধ জনতা| একই সময়ে আকিকুর রহমান শিপু’র ভটিশ্বরের “চাঁদ বাগান” বাড়িটিও ক্ষুব্ধ জনতা আগুনে পুড়ে দেয়!
ড. ইউনুছের নেতৃত্বাধীন বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে আকিকুর রহমান শিপুর বিরুদ্ধে দুদক তদন্ত শুরু করে এবং তার বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা জারি করে| সেই সময় গোপনে বিদেশে যাওয়ার সময় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তাকে আটক করা হয়| কিন্তু সুচতুর আকিকুর রহমান চৌধুরী (শিপু) তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছোটবেলার বন্ধু সিলেট জেলা বিএনপি’র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ইশতিয়াক আহমেদ সিদ্দিকীর সহায়তায় রক্ষা পেয়ে যান| কারাগারের বদলে তিনি তার ঢাকাস্থ গুলশানের বিলাসবহুল বাড়িতে অবস্থানের সুযোগ পান| শুধু তাই নয়, তিনি বুক ফুলিয়ে নিজের ব্যবসা পরিচালনা করছেন|
সূত্র জানায়, সিলেটের বিএনপি নেতা ইশতিয়াক আহমেদ সিদ্দিকী প্রবাসী কল্যাণ ও ˆবদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীর ঘনিষ্টজন হওয়ার সুযোগকে কাজে লাগিয়ে আকিকুর রহমান চৌধুরী (শিপু) নিজের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া সকল মামলা থেকে পরিত্রাণ পেয়েছেন এবং দুদক এর মামলার নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়ার পায়তারা করছেন|
স্থানীয়রা জানান, বিএনপি নেতা ইশতিয়াক আহমেদ সিদ্দিকী প্রবাসী কল্যাণ ও ˆবদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীর এতটাই ঘনিষ্ট যে, তিনি ঢাকায় অবস্থানকালে মন্ত্রীর বাসায় বসবাস করেন| আর এ সুযোগটাকেই কাজে লাগাচ্ছেন আকিকুর রহমান চৌধুরী (শিপু)| স্থানীয়দের ধারণা- ইশতিয়াক সিদ্দিকীর প্রভাবে আকিকুর রহমান শিপু দুদক থেকেও রেহাই পেয়ে যাবেন|
Leave a Reply