বিআরটিএ কর্মকর্তা হারুনের ‘ঘুষের সাম্রাজ্য’: উচ্চমান সহকারী হয়েও কোটি টাকার সম্পদ, সিন্ডিকেট আর বিলাসী জীবন
ঢাকা: সরকারি চাকরিতে পদবি তার ‘উচ্চমান সহকারী’। কাজ মূলত ফাইলের হিসাব রাখা ও দাপ্তরিক সহায়তা দেওয়া। কিন্তু তার জীবনযাপন, দাপট এবং সম্পদের পরিমাণ দেখলে খোদ উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তারাও বিস্মিত হবেন। তিনি বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) ঢাকা মেট্রো সার্কেল-৪ (পূর্বাঞ্চল)-এর উচ্চমান সহকারী হারুন ইসলাম ওরফে হারুনুর রশিদ। বিআরটিএ-তে তিনি পরিচিত এক ‘ঘুষের রাজা’ হিসেবে। লাগামহীন ঘুষ বাণিজ্য, দালাল সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ এবং ক্ষমতার চরম অপব্যবহার করে তিনি গড়ে তুলেছেন অবৈধ সম্পদের পাহাড়।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, হারুন ইসলামের কাছে বিআরটিএ অফিসে ঘুষ আদান-প্রদান কোনো অপরাধ নয়, বরং এটি তার ‘অঘোষিত নিয়ম’। সেবা নিতে আসা ভুক্তভোগী গ্রাহক ও অফিসের অন্য কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলে এই দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার চাঞ্চল্যকর সব আমলনামা বেরিয়ে এসেছে।
দালাল সিন্ডিকেট ও ‘ক্যাশিয়ার’ হারুন
বিআরটিএ ঢাকা মেট্রো সার্কেল-৪-এ সেবা নিতে আসা গ্রাহকদের জন্য এক মূর্তিমান আতঙ্কের নাম হারুন ইসলাম। অভিযোগ রয়েছে, সরাসরি কোনো গ্রাহক তার কাছে সেবার জন্য গেলে তিনি তাদের নানা অজুহাতে হয়রানি করেন। কখনো কাগজপত্রে ত্রুটি ধরেন, কখনো নতুন নিয়মের কথা বলে ফিরিয়ে দেন। কিন্তু অফিসের গেট বা আশপাশে অবস্থান করা দালালদের মাধ্যমে গেলে সেই একই কাজ জাদুর মতো মুহূর্তের মধ্যে সম্পন্ন হয়ে যায়।
জানা যায়, এই দপ্তরে দায়িত্বপ্রাপ্ত মোটরযান পরিদর্শক অসীম পালের ‘ক্যাশিয়ার’ হিসেবে নেপথ্যে কাজ করেন হারুন। সহকারী পরিচালক, মোটরযান পরিদর্শক ও রাজস্ব কর্মকর্তাদের সঙ্গে একটি শক্তিশালী অসাধু চক্র গড়ে তুলেছেন তিনি। এই চক্রের মূল চালিকাশক্তি হলো হারুনের নিয়ন্ত্রিত দালাল বাহিনী। জীকু, জাহাঙ্গীর, মনির, শাহাদাত ও সুলতানসহ বেশ কয়েকজন দালাল এই সিন্ডিকেটের সক্রিয় সদস্য। বিআরটিএ এলাকায় এই দালালরা ‘গেটিস’ নামে পরিচিত। তাদের মাধ্যমে প্রতিদিন বিভিন্ন যানবাহনের ফিটনেস, লাইসেন্স ও অন্যান্য কাগজপত্রের কাজের বিনিময়ে লাখ লাখ টাকা অবৈধভাবে আদায় করা হয়, যার বড় একটি অংশ যায় হারুনের পকেটে।
সেবা নিতে আসা ভুক্তভোগীদের অনেকেই জানান, হারুনের আচরণ অত্যন্ত চতুর। তার মুখে সবসময় একটি রহস্যময় হাসি লেগে থাকে। কিন্তু সেই নিরীহ হাসির আড়ালেই তিনি অত্যন্ত সুকৌশলে অনিয়মকে নিয়মে পরিণত করেন। টাকা ছাড়া তার টেবিল থেকে কোনো ফাইল এক ইঞ্চিও নড়ে না।
ক্ষমতার দাপট ও ভুয়া পরিচয়
শুধু ঘুষ বাণিজ্যই নয়, হারুনের ক্ষমতার দাপটও বিআরটিএ-তে বেশ আলোচিত। অনুসন্ধানে জানা যায়, গত প্রায় ১৫ বছর ধরে তিনি ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক বলয়ের প্রভাবশালী এক পুলিশ কর্মকর্তার আত্মীয় পরিচয় দিয়ে আসছেন। এই ভুয়া বা দূরবর্তী পরিচয়ের দাপট দেখিয়ে তিনি অফিসের সহকর্মী থেকে শুরু করে সাধারণ গ্রাহকদের প্রতিনিয়ত ভয়ভীতি দেখান। কেউ তার দুর্নীতির প্রতিবাদ করলে বা ঘুষ দিতে অস্বীকৃতি জানালে এই প্রভাবশালী আত্মীয়ের নাম ভাঙিয়ে তাদের পুলিশি হয়রানির হুমকি দেওয়া হতো বলেও গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।
দুর্নীতির পুরোনো রেকর্ড ও বদলি বাণিজ্য
হারুন ইসলামের দুর্নীতির এই গল্প নতুন নয়। এর আগে তিনি মিরপুর-১৩ নম্বর বিআরটিএ কার্যালয়ের ১১৪ নম্বর কক্ষে দায়িত্ব পালন করতেন। সেখানে থাকাকালীন দালালদের মাধ্যমে কোটি টাকার ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছিল তার বিরুদ্ধে। বিষয়টি সে সময় বিভিন্ন গণমাধ্যমে ফলাও করে প্রচারিত হলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বাধ্য হয়ে তাকে সিলেট মেট্রো সার্কেলে বদলি করে।
কিন্তু দুর্নীতির শেকড় যার এত গভীরে, বদলি তাকে দমাতে পারেনি। অভিযোগ রয়েছে, সিলেটে বদলি হওয়ার অল্প কিছুদিনের মধ্যেই মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে এবং ওপরমহলে তদবির করে তিনি পুনরায় ঢাকায় বদলি হয়ে আসেন। ঢাকায় ফিরে তিনি ঢাকা মেট্রো সার্কেল-৪-এ যোগ দেন এবং আগের চেয়ে আরও বেপরোয়াভাবে নিজের পুরোনো কর্মকাণ্ড ও সিন্ডিকেট বাণিজ্য শুরু করেন।
বিলাসী জীবন ও সম্পদের পাহাড়
বিআরটিএ-র একজন সাধারণ উচ্চমান সহকারী হয়েও হারুন ইসলামের জীবনযাপন রীতিমতো চোখ ধাঁধানো। সরকারি বেতনের সামান্য টাকায় তার এই রাজকীয় জীবনযাপন সবার মনেই প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
সিলেটে বদলি থাকাকালীন সময়ে যাতায়াতের জন্য তিনি নিয়মিত উড়োজাহাজ (বিমান) ব্যবহার করতেন। একজন সাধারণ কেরানির পক্ষে আকাশপথে নিয়মিত যাতায়াতের এই ব্যয়ভার কীভাবে বহন করা সম্ভব, তা নিয়ে খোদ বিআরটিএ-র ভেতরেই তুমুল সমালোচনা ছিল।
ঘুষ ও দুর্নীতির মাধ্যমে উপার্জিত কালো টাকায় তিনি রাজধানীতে গড়ে তুলেছেন বিপুল সম্পদ। মিরপুরের সেনপাড়া পর্বতা এলাকার ৪২৯/এ নম্বর ভবনে প্রায় দুই হাজার বর্গফুটের দুটি বিশাল ও বিলাসবহুল ফ্ল্যাট ক্রয় করেছেন তিনি। বর্তমানে তিনি সেই আলিশান ফ্ল্যাটেই সপরিবারে বসবাস করেন। এছাড়া নামে-বেনামে তার আরও বিপুল পরিমাণ স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ রয়েছে বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নির্বিকার হারুন ও তদন্তের দাবি
তার বিরুদ্ধে ওঠা এসব পাহাড়সম দুর্নীতির বিষয়ে কথা বলার জন্য হারুন ইসলামের ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু সাংবাদিকের পরিচয় পাওয়ার পর তিনি ফোন রিসিভ করে বারবার কল কেটে দেন। পরবর্তীতে এসএমএস পাঠানো হলেও তিনি কোনো উত্তর দেননি।
অন্যদিকে, বিআরটিএর কয়েকজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “একজন উচ্চমান সহকারীর বেতন স্কেল কত, তা সবারই জানা। এই বেতনে ঢাকায় একাধিক বিশাল ফ্ল্যাট কেনা এবং বিমানে যাতায়াত করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। তার আয়ের সঙ্গে সম্পদের কোনো মিল নেই। বিষয়টি স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে তদন্ত হওয়া উচিত।”
ভুক্তভোগী গ্রাহক ও সচেতন মহলের দাবি, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং বিআরটিএর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের উচিত হারুন ইসলামের এই ‘ঘুষের সাম্রাজ্য’ ভেঙে দেওয়া। দ্রুততম সময়ের মধ্যে তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা, তার আয়-ব্যয়ের হিসাব ও সম্পদের উৎস যাচাই করে অবৈধ সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা এবং দৃষ্টান্তমূলক আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার জোর দাবি জানিয়েছেন তারা। অন্যথায় বিআরটিএ-র মতো সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কখনোই কমবে না।
Leave a Reply