বাংলাদেশের ফুটবলে বইছে বসন্তের হাওয়া। দক্ষিণ এশিয়ার শ্রেষ্ঠত্বের লড়াইয়ে ভারতকে ধূলিসাৎ করে সাফ অনূর্ধ্ব-২০ চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপা অক্ষুণ্ন রেখেছে বাংলাদেশের বাঘেরা। টানা দ্বিতীয়বারের মতো এই গৌরবময় অর্জনের পর এবার বীর সন্তানদের রাজকীয়ভাবে বরণ করে নেয় বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে)। নারী ফুটবল দলের পর এই প্রথম পুরুষ ফুটবলের কোনো দল দেশে ফিরেছে ছাদখোলা বাসের রাজকীয় অভিবাদন নিয়ে।
গতকাল শনিবার বাফুফের মিডিয়া বিভাগ থেকে জানানো হয়েছে, শিরোপাজয়ী এই তরুণতুর্কিদের বরণ করে নিতে রাজধানী ঢাকা সেজেছে এক বর্ণিল সাজে। বিমানবন্দর থেকে শুরু করে হাতিরঝিলের জলরাশি পর্যন্ত বিস্তৃত হয় এই বিজয় শোভাযাত্রা।
বিজয় মিছিলের রুটম্যাপ- বিমানবন্দর থেকে হাতিরঝিল : ঐতিহাসিক এই সাফল্যের বীরদের স্বাগত জানাতে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে করা হয় বিশেষ আয়োজন। সেখান থেকেই শুরু হয় মূল উৎসব। বাফুফে সূত্র নিশ্চিত করে যে, একটি সুসজ্জিত ছাদখোলা বাসে করে চ্যাম্পিয়ন খেলোয়াড়দের নিয়ে আসা হয়েছে।
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে যাত্রা শুরু করে পৌঁছায় হাতিরঝিল অ্যাম্ফিথিয়েটার। মূল অনুষ্ঠানরাত আনুমানিক ৭টা ৩০ মিনিটে শুরু হয় হাতিরঝিল অ্যাম্ফিথিয়েটারে, সেখানে তাদের আনুষ্ঠানিক সংবর্ধনা দেয়া হয়।
বাফুফের পক্ষ থেকে সাধারণ ফুটবলপ্রেমী ও সমর্থকদের এই শোভাযাত্রায় অংশ নেয়ায় এবং রাস্তার দুপাশে দাঁড়িয়ে চ্যাম্পিয়নদের হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানানোয় ধন্যবাদ জানানো হয়। দেশের ফুটবলে সামপ্রতিক সময়ের স্থবিরতা কাটিয়ে এই জয় যে নতুন প্রাণের সঞ্চার করেছে, তার প্রতিফলন দেখা যায় এই জনসমুদ্রে।
ফাইনালে স্নায়ুচাপ ও রোনান সুলিভানের সেই ‘ম্যাজিক’ : গত শুক্রবার ভারতের মাটিতে অনুষ্ঠিত ফাইনালে যে রোমাঞ্চ ছড়িয়েছে বাংলাদেশের যুবারা, তা ফুটবল ইতিহাসে দীর্ঘকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে। নির্ধারিত সময়ের ৯০ মিনিটের লড়াইয়ে দুই দলই আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণ চালালেও জালের দেখা পায়নি কেউ। ফলে ম্যাচ গড়ায় ভাগ্যনির্ধারণী টাইব্রেকারে।
টাইব্রেকারেও চলছিল সমানে সমান লড়াই। ৩-৩ সমতায় যখন গ্যালারিতে পিনপতন নীরবতা, তখন পেনাল্টি নিতে এগিয়ে আসেন বাংলাদেশের তরুণ ফরোয়ার্ড রোনান সুলিভান। গোল করলেই ইতিহাস, আর মিস করলেই ভারতের সুযোগ- এমন এক কঠিন সমীকরণের মুখে রোনান যা করলেন, তা অবিশ্বাস্য।
বিশ্বসেরা ফুটবলারদের মতো অসীম সাহসিকতায় এক চমৎকার ‘পানেনকা’ শটে বল জালে জড়ান তিনি। ভারতীয় গোলরক্ষককে সম্পূর্ণ পরাস্ত করে বল যখন জালের উপরের অংশে আছড়ে পড়ে, তখন কানায় কানায় পূর্ণ স্টেডিয়ামে আছড়ে পড়ে লাল-সবুজের গর্জন। এই জয়ের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ কেবল শিরোপাই জেতেনি, বরং দক্ষিণ এশিয়ায় নিজেদের শ্রেষ্ঠত্বের রাজদণ্ড আরও মজবুত করল।
হাতিরঝিলের বর্ণিল আয়োজন, এক নতুন ইতিহাস : এর আগে সাফজয়ী নারী ফুটবল দল দুইবার ছাদখোলা বাসে করে ঢাকা শহর প্রদক্ষিণ করেছিল। তবে পুরুষ ফুটবলের কোনো বয়সভিত্তিক বা জাতীয় দলের জন্য এমন আয়োজন এই প্রথম। বাফুফে মনে করছে, এই সম্মাননা তরুণ খেলোয়াড়দের ভবিষ্যতে আরও বড় সাফল্যের দিকে ধাবিত করবে।
হাতিরঝিলের অ্যাম্ফিথিয়েটারে আয়োজিত এই সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে দেশের বিশিষ্ট ক্রীড়াব্যক্তিত্ব, বাফুফে কর্মকর্তা এবং সরকারের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। আলোকসজ্জা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বরণ করে নেয়া হয় অপরাজিত এই বীরদের। হাতিরঝিলের উন্মুক্ত আকাশ আর পানির কোল ঘেঁষে এই উদযাপন হয় ফুটবলের এক মহোৎসব।
সুলিভান পরিবারের দ্বিগুণ আনন্দ : এবারের সাফ জয়ের গল্পের পেছনে রয়েছে এক আবেগময় পারিবারিক প্রেক্ষাপট। দলের গুরুত্বপূর্ণ দুই সদস্য রোনান সুলিভান ও তার ভাই মাঠে যখন ঘাম ঝরাচ্ছিলেন, তখন হাজার মাইল দূরে টিভির সামনে বসে প্রতিটি মুহূর্তের সাক্ষী ছিল পুরো সুলিভান পরিবার। টাইব্রেকারে রোনানের সেই জাদুকরী গোলের পর কেবল মাঠেই নয়, উল্লাসে ফেটে পড়েছিল সুদূর প্রবাসে থাকা তাদের স্বজনরাও। এক পরিবার থেকে দুই ভাইয়ের এমন জাতীয় বীরত্বগাথা বাংলাদেশের ফুটবলে এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
ফুটবলের নবজাগরণ : সাফ অনূর্ধ্ব-২০ চ্যাম্পিয়নশিপের এই জয় প্রমাণ করে যে, সঠিক পরিচর্যা ও সুযোগ পেলে বাংলাদেশের ফুটবলের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল। ভারতবধের এই কাব্য কেবল একটি ট্রফি জয় নয়, বরং এটি কোটি বাঙালির আত্মবিশ্বাস পুনরুদ্ধারের গল্প।
গতকাল রাতে হাতিরঝিলের আকাশে যখন আতশবাজি ফুটে, তখন তা কেবল একদল তরুণের সাফল্যকে উদযাপন করেনি না, বরং বাংলাদেশের ফুটবল আবার স্বমহিমায় ফিরতে শুরু করেছে। বাফুফের এই আয়োজন ফুটবলারদের প্রতি জাতির কৃতজ্ঞতা প্রকাশের এক অনন্য মাধ্যম হয়ে থাকবে। তাই তো আজ সবার মুখে একই স্লোগান- সাবাস বাংলাদেশ, সাবাস বাংলার যুবারা!
Leave a Reply