জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশ আজ এক অনন্য রোল মডেল। সেই ধারাবাহিকতায় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস, আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর গবেষণা এবং দক্ষ জনবল তৈরির লক্ষ্যে গাজীপুরের টঙ্গীতে যাত্রা শুরু করল দেশের প্রথম ‘জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট’।

গাজীপুরের ধরপাড়ার সাতাইশ চৌরাস্তায় প্রায় ৮ একর জমির ওপর এই ঐতিহাসিক প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ভিত্তিপ্রস্তর উন্মোচন শেষে প্রধানমন্ত্রী প্রাঙ্গণে বৃক্ষরোপণ করেন এবং পুকুরে মাছের পোনা অবমুক্ত করেন। এরপর তিনি সেখানে আয়োজিত সুধী সমাবেশে অংশ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য রাখেন।
সুধী সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার চিরাচরিত ধারণায় পরিবর্তনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, “আমাদের লক্ষ্য কেবল দুর্যোগ-পরবর্তী ত্রাণ বিতরণ নয়, বরং দুর্যোগের ঝুঁকি কমিয়ে জীবন ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি সর্বনিম্ন পর্যায়ে নিয়ে আসা। আর সেই লক্ষ্য পূরণে প্রয়োজন অত্যাধুনিক গবেষণা ও দক্ষ জনবল।”
তিনি আরও বলেন, “দুর্যোগ প্রশমনে আমাদের আধুনিক ও বিজ্ঞানভিত্তিক পদক্ষেপ গ্রহণের কোনো বিকল্প নেই। এই ইনস্টিটিউটটি হবে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় গবেষণার প্রধান কেন্দ্র। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি বিশ্লেষণ করে কার্যকর কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ এবং বৈশ্বিক মানের বিশেষজ্ঞ তৈরিতে এটি যুগান্তকারী ভূমিকা রাখবে।”
প্রধানমন্ত্রী স্থানীয় জনগণের সম্পৃক্ততার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে বলেন, “যেকোনো দুর্যোগে স্থানীয় মানুষই প্রথম সাড়া দেয় এবং সবার আগে আক্রান্ত হয়। তাই দুর্যোগকালীন সচেতনতা বৃদ্ধি এবং তৃণমূল পর্যায়ে সক্ষমতা তৈরি করা আমাদের বড় দায়িত্ব। এই প্রতিষ্ঠানটি কেবল কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণই দেবে না, বরং তৃণমূলের মানুষকে দুর্যোগ সহনশীল করে গড়ে তুলতেও কাজ করবে।”
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের কাজের ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, “দুর্যোগের ঝুঁকি হ্রাসে এবং দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়াতে আমাদের ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের কর্মীরা যেভাবে নিরলস পরিশ্রম করছেন, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। আপনাদের নিষ্ঠা ও আন্তরিকতাই আজ আমাদের বিশ্বমঞ্চে এক সফল রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিতি দিয়েছে। এই ইনস্টিটিউট নির্মাণের মাধ্যমে আপনাদের সেই কর্মদক্ষতাকে আরও আধুনিক ও যুগোপযোগী করে গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হলো।”
প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রায় ৮ একর জমির ওপর নির্মিত এই ইনস্টিটিউটটি দক্ষিণ এশিয়া তথা বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ দুর্যোগ গবেষণা কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হবে। এর প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলোর মধ্যে রয়েছে:
অত্যাধুনিক প্রশাসনিক ভবন: যা সমস্ত প্রাতিষ্ঠানিক ও গবেষণা কার্যক্রমের কেন্দ্রবিন্দু হবে।
আন্তর্জাতিক মানের গবেষণাগার: যেখানে দুর্যোগের পূর্বাভাস, প্রভাব এবং প্রশমন নিয়ে আধুনিক গবেষণা পরিচালিত হবে।
সুসজ্জিত আবাসিক সুবিধা: দেশি-বিদেশি প্রশিক্ষণার্থীদের জন্য থাকবে আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন আবাসিক ভবন।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু, প্রতিমন্ত্রী এম ইকবাল হোসেইন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব সাইদুর রহমান খানসহ সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিবৃন্দ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ইনস্টিটিউটটি পূর্ণাঙ্গ রূপ পেলে বাংলাদেশ কেবল প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় স্বয়ংসম্পূর্ণই হবে না, বরং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ তৈরির একটি বড় কেন্দ্রে পরিণত হবে, যা বিশ্ববাসীর জন্য বাংলাদেশের এক নতুন অর্জন হয়ে থাকবে।
Leave a Reply