— মো. আল-আমিন
একটি সাগর রক্তের বিনিময়ে অর্জিত এই বাংলাদেশের অপার সম্ভাবনা আজ যে ব্যাধির কারণে বারবার মুখ থুবড়ে পড়ছে, তা হলো—দুর্নীতি। ফিরোজ খানের সেই কালজয়ী চরণের মতোই বলতে হয়, ‘দুর্নীতি কখনও হয়না সুনীতি, এ এক ভয়ানক মানসিক ব্যাধি।’
সম্প্রতি দেশের ব্যাংকিং খাতে ৫ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকার পাহাড়সম খেলাপি ঋণ এবং বড় বড় করপোরেট হাউসের লুণ্ঠন প্রক্রিয়া আমাদের জাতীয় জীবনের সেই গভীর ক্ষতের চিত্রই ফুটিয়ে তুলেছে। রাজউকের সামান্য কর্মচারী থেকে শুরু করে উচ্চপর্যায়ের নীতিনির্ধারক—সবার মধ্যেই যেন অবৈধ সম্পদ গড়ার এক অসুস্থ প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে।
দুর্নীতি কেবল একটি অর্থনৈতিক অপরাধ নয়; এটি একটি জাতির নৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার প্রক্রিয়া। যখন ডিএনসিসির মতো সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে রাজস্ব বিভাগকে অন্ধকারে রেখে কোটি কোটি টাকার লুণ্ঠন চলে, কিংবা রাজউকের নকশা জালিয়াতি করে জিরো থেকে হিরো বনে যান একদল কর্মকর্তা, তখন সাধারণ জনগণের দীর্ঘশ্বাস আর রাষ্ট্রের উন্নয়ন একাকার হয়ে যায়। আমাদের আর্থ-সামাজিক জীবনের প্রতিটি পরতে আজ দুর্নীতির কালো হাত সমাজকে গ্রাস করছে। এটি জাতীয় উন্নয়নের সবচেয়ে বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তবে হতাশার মধ্যেও আশার আলো আছে। বর্তমানে যে শুদ্ধি অভিযান শুরু হয়েছে, বিশেষ করে বেক্সিমকোর মতো প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠানে রিসিভার নিয়োগ বা রাজউকের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দুদকের অনুসন্ধান—এগুলো আমাদের সুশাসন প্রতিষ্ঠার পথ দেখায়। কিন্তু মনে রাখতে হবে, কেবল আইনি পদক্ষেপই যথেষ্ট নয়। দুর্নীতির এই শেকড় উৎপাটন করতে হলে একটি শক্তিশালী সামাজিক আন্দোলনের বিকল্প নেই। গণমাধ্যমের কার্যকর ভূমিকা এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। অপরাধীদের মুখোশ উন্মোচন করে জনগণের সামনে তুলে ধরা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।
আজ বাংলাদেশের এই ক্রান্তিলগ্নে আমাদের শপথ নিতে হবে—একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র গড়ার। দুর্নীতির এই মানসিক ব্যাধি থেকে মুক্তির জন্য প্রয়োজন কঠোর আইন এবং তার নিরপেক্ষ প্রয়োগ। প্রশাসন থেকে শুরু করে ব্যবসায়িক খাত—কোথাও যেন কোনো ‘লুটেরা সিন্ডিকেট’ মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে, সেদিকে তীক্ষ্ণ নজর রাখতে হবে।
পরিশেষে বলতে চাই, দুর্নীতি প্রতিরোধ সম্ভব যদি আমরা সম্মিলিতভাবে আওয়াজ তুলি। আমাদের শ্লোগান হোক—‘ঘুষ নেব না, ঘুম দেব না; কাউকে দুর্নীতি করতে দেব না।’
একটি দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার এই লড়াইয়ে ‘দৈনিক ভোরের হাওয়া‘ সবসময় সত্যের পক্ষে আপসহীন থাকবে। লুণ্ঠিত প্রতিটি পয়সার হিসাব আদায় না হওয়া পর্যন্ত আমাদের কলম থামবে না।
-মো:আল-আমিন, নির্বাহী সম্পাদক,দৈনিক ভোরের হাওয়া
Leave a Reply