দেশের বিচারব্যবস্থার প্রধান কেন্দ্র সুপ্রিম কোর্ট সংলগ্ন গুরুত্বপূর্ণ দুই রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান—অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয় ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয়ে দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করা হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে ঘুষ গ্রহণ ও পেশাগত অসদাচরণের অভিযোগে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে নেওয়া দৃশ্যমান পদক্ষেপগুলো আইন-আদালত অঙ্গনে ইতিবাচক সাড়া ফেলেছে।
অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ে কঠোর ব্যবস্থা
রাষ্ট্রের আইনি প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিতকারী অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা ফেরাতে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করেছেন নবনিযুক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস (কাজল)।
সম্প্রতি সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আবুল হাসানের বিরুদ্ধে জনৈক বিচারপ্রার্থীর কাছ থেকে ৩ কোটি ২০ লাখ টাকা ঘুষ গ্রহণের একটি লিখিত অভিযোগ আসে। মামলার স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করে দেওয়ার প্রলোভনে এই বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগের প্রেক্ষিতে তদন্ত শুরু হয়। এ বিষয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল জানান, দায়িত্ব গ্রহণের দ্বিতীয় দিনেই তিনি অভিযোগটি পান এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বক্তব্য সন্তোষজনক না হওয়ায় ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। ফলশ্রুতিতে, গত ৬ এপ্রিল রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে আবুল হাসানকে তার পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।
এছাড়া, জনগুরুত্বপূর্ণ একটি রিট মামলার ফাইল উদ্দেশ্যমূলকভাবে হাইকোর্টে উপস্থাপন না করে রাষ্ট্রের ক্ষতি করার অভিযোগে গত ১৬ এপ্রিল মো. ইমরান হোসেন নামে এক অফিস সহায়ককে পুলিশের হাতে সোপর্দ করা হয়েছে। শাহবাগ থানায় তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা দায়ের করেছেন কার্যালয়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. নাসির উদ্দিন। এ প্রসঙ্গে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন:
”আমাদের এই প্রতিষ্ঠানটি রাষ্ট্রকে প্রতিনিধিত্ব করে। এখানে কর্মরতদের নীতি-নৈতিকতা হতে হবে উন্নত মানের। কোনো প্রকার অনিয়ম বা দুর্নীতির প্রশ্রয় এখানে দেওয়া হবে না।”
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তদন্ত কমিটি
অন্যদিকে, চব্বিশের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান সংশ্লিষ্ট মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে সফলতা দেখাচ্ছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। এ পর্যন্ত চারটি রায়ে ১৩ জনের মৃত্যুদণ্ডসহ বিভিন্ন মেয়াদে সাজা ঘোষণা করা হয়েছে। তবে এই বিচারিক প্রক্রিয়ার অংশ প্রসিকিউশন টিমের কয়েকজন সদস্যের বিরুদ্ধে গুরুতর দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, চট্টগ্রামে গ্রেফতার হওয়া এক সাবেক সংসদ সদস্যকে জামিন পাইয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে এক প্রসিকিউটর কোটি টাকা দাবি করেছেন, যার একটি ফোনালাপ সংবাদমাধ্যমে ফাঁস হয়েছে। এছাড়া অন্য এক প্রসিকিউটরের কক্ষে আসামির স্ত্রীর রহস্যজনক ব্যাগ নিয়ে প্রবেশের অভিযোগও তদন্তাধীন রয়েছে।
এসব অভিযোগ খতিয়ে দেখতে গত ১০ মার্চ একটি ‘ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি’ গঠন করেছেন চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম। তিনি জানান, কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে দ্রুত কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। চিফ প্রসিকিউটর বলেন:
”আমরা দুর্নীতির ব্যাপারে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছি। ট্রাইব্যুনালের কোনো প্রসিকিউটর বা তদন্ত সংশ্লিষ্ট কেউ যদি দুর্নীতির চিন্তা করেন, তবে সেটি তাদের জন্য আত্মঘাতী হবে।”
ইতিবাচক প্রভাব
আইনজীবীরা মনে করছেন, রাষ্ট্রের উচ্চপর্যায়ের এই দুই কার্যালয়ে দুর্নীতির বিরুদ্ধে নেওয়া এই সাম্প্রতিক পদক্ষেপগুলো বিচারপ্রার্থীদের আস্থা বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে। স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার এই ধারা অব্যাহত থাকলে দেশের সামগ্রিক বিচারব্যবস্থা আরও শক্তিশালী হবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
Leave a Reply